ম্যাগনিটস্কি জবাবদিহি আইন

নিষেধাজ্ঞা থেকে বের হওয়ার তিনটি উপায় আছে

ম্যাগনিটস্কি জবাবদিহি আইন

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২১ ডিসেম্বর ২০২১, ০৩:০৮ পিএম



তিন উপায়ে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্র তার ‘গ্লোবাল ম্যাগনিটস্কি জবাবদিহি আইনে’ র‌্যাব এবং এর সাবেক ও বর্তমান ছয়জন শীর্ষ কর্মকর্তাকে নিষিদ্ধ করেছে। ওই আইনেই নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্ত হওয়ার পথ বাতলানো আছে।


বাংলাদেশ সরকার র‌্যাবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে। আবার একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে চায়। গতকাল সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে সংবাদ ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদসচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম জানিয়েছেন, সরকারের স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের এই নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে কাজ করছেন।


যুক্তরাষ্ট্র নিষিদ্ধের তালিকায় থাকা র‌্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ও বর্তমান আইজিপি বেনজীর আহমেদ ও বাকি পাঁচজনের পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বরসহ সব তথ্য প্রকাশ করে দিয়েছে। তবে শুধু ভিসা নিষেধাজ্ঞায় রাখা লে. কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদের ব্যক্তিগত তথ্য উন্মুক্ত করা হয়নি।


মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ‘২০২১ সালের পররাষ্ট্র দপ্তর, বৈদেশিক কার্যক্রম ও তহবিল সম্পর্কিত আইনেও’ র‌্যাবের সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ (বর্তমানে পুলিশের মহাপরিদর্শক) ও র‌্যাব-৭-এর কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদকে যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ করেছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ২০১৮ সালে ‘লেহি আইনের’ মাধ্যমে ওই দেশে র‌্যাবের প্রশিক্ষণ নিষিদ্ধ করে।


বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের এসব আইন ও এর প্রয়োগের সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো পর্যালোচনা করছেন। গত রবিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ‘লেহি আইন’ নিয়ে আলোচনাও করেছেন।


যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে মস্কোর কারাগারে রাশিয়ার কর আইনজীবী সার্গেই ম্যাগনিটস্কির মৃত্যুর জন্য দায়ী রুশ কর্মকর্তাদের বিচারের জন্য ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসে সার্গেই ম্যাগনিটস্কি জবাবদিহি সংক্রান্ত আইনের খসড়া গৃহীত হয়। ওই বছরের ডিসেম্বর মাসে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার স্বাক্ষর করার মধ্য দিয়ে তা আইনে পরিণত হয়।


২০১৬ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হিসেবে ওই আইন প্রয়োগ করে আসছে। এই আইনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষিত নিষিদ্ধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়। এ ছাড়া ওই নিষিদ্ধ ব্যক্তিরা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারেন না।


নিষেধাজ্ঞা থেকে বের হওয়ার  তিন উপায়


ম্যাগনিটস্কি আইনের ৪০৪ ধারায় নিষেধাজ্ঞা থেকে বেরোনোর তিনটি পথের কথা উল্লেখ আছে। এক. যে অভিযোগে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তেমন অপরাধ সংঘটনে যুক্ত নয়—এমন বিশ্বাসযোগ্য তথ্য দিতে হবে।


দুই. অভিযুক্ত ব্যক্তিকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় বিচার করা।


তিন. অভিযুক্ত ব্যক্তির আচরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসা, অপরাধের উপযুক্ত শাস্তি হওয়া এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ করবেন না বলে বিশ্বাসযোগ্য অঙ্গীকার করা।


ওই তিনটি উপায়ের কোনো একটি অবলম্বন করে নিষিদ্ধ ব্যক্তি বা সংস্থা এসংক্রান্ত কংগ্রেস কমিটির সভাপতি ও র্যাংকিং সদস্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে চিঠি লিখে জানাতে পারে। সে ক্ষেত্রে ১২০ দিনের মধ্যে প্রেসিডেন্ট তাঁর জবাব দেবেন। জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয় হলে প্রেসিডেন্ট গোপনীয় চিঠির মাধ্যমেও জবাব দিতে পারেন। সন্তুষ্ট হলে তিনি ন্যূনতম ১৫ দিন পর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আদেশ জারি করবেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের করা নির্বাহী আদেশে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের এই ক্ষমতা সে দেশের অর্থমন্ত্রীকে দেওয়া হয়েছে।


র‌্যাবের সদস্য হলে বিদেশভ্রমণে বিশেষ যাচাই-বাছাই


ম্যাগনিটস্কি আইনের বিধান অনুযায়ী, নিষিদ্ধ সংস্থার সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পেতে কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের সম্মুখীন হতে হয়। পশ্চিমা কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রের এই নিষেধাজ্ঞা অনুসরণ করলে সে দেশও নিষিদ্ধ সংস্থার সদস্যদের ক্ষেত্রে ভ্রমণে কড়াকড়ি আরোপ করে। ২০১৮ সালে ম্যাগনিটস্কি আইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দুটি ডিভিশনকে যুক্তরাষ্ট্র নিষিদ্ধ করেছিল। এর পর থেকে ওই দুই ডিভিশনের সদস্যদের কারো যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের নজির পাওয়া যায়নি।


সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কোনো বাহিনী ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত হলে বিদেশে যাওয়া, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে যাওয়ার আগে এর সদস্যদের ভূমিকা নিবিড়ভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়।


যুক্তরাষ্ট্র গত শুক্রবার র‌্যাবকে ওই একই আইনে নিষিদ্ধ করেছে। পাশাপাশি র‌্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাতজন শীর্ষ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে দেশটি। তারা আইজিপি বেনজীর আহমেদসহ ছয়জনের পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বরসহ সব তথ্য প্রকাশ করে দিয়েছে।


তালিকায় থাকা অন্য পাঁচ কর্মকর্তা হলেন র‌্যাব মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন, র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) খান মোহাম্মদ আজাদ, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) তোফায়েল মুস্তাফা সারোয়ার, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ও মোহাম্মদ আনোয়ার লতিফ খান।


কানাডা, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে একই ধাঁচের জবাবদিহি আইন আছে। এ অবস্থায় অনেক দেশই নিষিদ্ধ সংস্থা ও তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ করবে। পশ্চিমা দেশগুলোতে ভিসা আবেদনের সময় আবেদনকারীকে জানাতে হয় তিনি কোনো দেশে নিষিদ্ধ কি না এবং এর কারণ কী।


যুক্তরাষ্ট্রের নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া সেন্টারের নন-রেসিডেন্ট সিনিয়র ফেলো রুদাবেহ্ শহীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, যাঁদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা তো পাবেনই না, পশ্চিমা অন্য দেশগুলোতেও ভিসা পেতে সমস্যা হবে। তিনি বলেন, বাহিনী হিসেবে র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় এর সদস্যদের ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া আগের চেয়ে দীর্ঘ হতে পারে। কারণ সবাই চাইবে ভিসা আবেদনকারী সম্পর্কে বিশদভাবে জানতে।


র‌্যাবের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য বেশ আগে থেকেই দাবি জানিয়ে আসছিল নিউ ইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সংস্থাটির দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি গ্লোবাল ম্যাগনিটস্কি নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে গতকাল সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, এই নিষেধাজ্ঞার ফলে র‌্যাব সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রে সফর, প্রশিক্ষণ বন্ধ হয়ে গেল। যুক্তরাষ্ট্রের এই নিষেধাজ্ঞা র‌্যাবের বিষয়ে অন্য দেশগুলোকেও সতর্ক করবে।


মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, বাংলাদেশ সরকারের উচিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ অস্বীকারের পরিবর্তে ঘটনাগুলো তদন্ত করা এবং অভিযুক্ত সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।


ভিসা থাকলেও বাতিল হতে পারে


বিভিন্ন দেশের সাবেক ও বর্তমান সরকারি কর্মকর্তা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যুক্তরাষ্ট্র ম্যাগনিটস্কি আইন প্রয়োগ করছে। আইনটির ৪০৫ ধারা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন, দুর্নীতি ও অর্থপাচারে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে কোনো ব্যক্তির ভিসা বাতিল করতে পারে। তবে নিষিদ্ধ ব্যক্তির জাতিসংঘের কোনো কাজে যুক্তরাষ্ট্র সফরের প্রয়োজন হলে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসংঘের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি অনুযায়ী ভিসা নিষেধাজ্ঞা থেকে ওই ব্যক্তিকে সাময়িক অব্যাহত দিতে পারেন।


যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ দপ্তর গত শুক্রবার এক ঘোষণায় বলেছে, ‘গ্লোবাল ম্যাগনিটস্কি মানবাধিকার জবাবদিহি আইন’ বাস্তবায়নে ১৩৮১৮ নম্বর নির্বাহী আদেশে র‌্যাব এবং এর সাবেক ও বর্তমান ছয় শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১০ জন বিদেশির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য ২০১৭ সালের ২০ ডিসেম্বর ওই নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন। ওই আদেশে ভবিষ্যতে নিষিদ্ধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার রূপরেখা উল্লেখ করা আছে।


ট্রাম্পের ওই নির্বাহী আদেশে মোট ১১টি অনুচ্ছেদ আছে। প্রথম অনুচ্ছেদে নিষিদ্ধ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে যুক্তরাষ্ট্র ও তার আওতাধীন এলাকায় থাকা সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার কথা বলা হয়েছে। ওই সম্পদ স্থানান্তর, প্রত্যাহার করা যাবে না।


দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, গ্লোবাল ম্যাগনিটস্কি নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশাধিকার থাকবে না। তৃতীয় ও চতুর্থ অনুচ্ছেদে নিষিদ্ধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বাজেয়াপ্ত অর্থ দান করার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। পঞ্চম অনুচ্ছেদে নিষিদ্ধ ব্যক্তিদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।


ষষ্ঠ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা, এমনকি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের শাখাগুলোকেও এই বিধি-নিষেধ মেনে চলতে হবে। সপ্তম অনুচ্ছেদে যুক্তরাষ্ট্রে এই আদেশ বাস্তবায়নে কোনো পূর্বানুমতির প্রয়োজনীয়তা নেই বলে উল্লেখ করা হয়।


অষ্টম অনুচ্ছেদে নির্বাহী আদেশ বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে অর্থমন্ত্রীকে এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। নবম অনুচ্ছেদে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ বাস্তবায়নে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।


দশম অনুচ্ছেদে নিষেধাজ্ঞা বা সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ প্রত্যাহারের বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অর্থমন্ত্রীকে দেওয়া আছে।


একাদশ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে আলোচনা করে অর্থমন্ত্রীকে নিষেধাজ্ঞা ও নির্বাহী আদেশ বাস্তবায়ন সংক্রান্ত প্রতিবেদন যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসে উপস্থাপন করতে হবে।