দেশে ডায়াবেটিসের ভয়াল থাবা

বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস হলো ডায়াবেটিস সম্পর্কে বিশ্বময় সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি ক্যাম্পেইন যা প্রতি বছর ১৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয়।

ডায়াবেটিস আসলে কী
ডায়াবেটিস এক ধরনের বিপাকতন্ত্রের রোগ। সাধারণত কোনো খাবার গ্রহণের পর আমাদের শরীর সেই খাদ্যের শর্করা ভেঙে গ্লুকোজে রূপান্তরণ করে। এরপর অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নামের যে হরমোন নিঃসৃত হয়, সেটি আমাদের শরীরের কোষের ছিদ্রপথ বড় করে দিয়ে গ্লুকোজ কোষগুলোতে ঢুকতে সাহায্য করে। এ গ্লুকোজ শরীরের জ্বালানি বা শক্তি হিসেবে কাজ করে। কোনো কারণে ইনসুলিনের পরিমাণ এবং কার্যক্ষমতা কমে গেলে গ্লুকোজ কোষে ঢুকতে না পেরে রক্তে জমা হয়। এক কথায়, শরীরে ইনসুলিন আছে, কিন্তু কাজ করতে পারছে না কিংবা ইনসুলিন তৈরিই হচ্ছে না- এ রকম একটি অবস্থা হলো ডায়াবেটিস। আমরা সাধারণত চার ধরনের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হই। টাইপ-১, টাইপ-২, জেস্টেশনাল ও অন্যান্য।

টাইপ-১ মানে হলো- যাদের শরীরে ইনসুলিন উৎপাদন হয় প্রয়োজনের তুলনায় কম অথবা হয়ই না। এ সব রোগীর ইনসুলিন ইঞ্জেকশন নিতে হয়। আলাদা করে ইনসুলিন না নিলে তারা মারা যেতে পারেন। টাইপ-২ হলো- বিটা সেল ইনসুলিন ঠিকমতো বরং বেশিই উৎপাদন করে কিন্তু সেটি কাজ করতে পারছে না রেজিস্ট্যান্স ডেভেলপ করায়। তখন আমরা যে খাবারই খাই, সেটির গ্লুকোজ হয়ে রক্তে অব্যবহৃত গ্লুকোজ বেড়ে যায় আর লিভারে জমা থাকে। বাংলাদেশসহ বিশ্বে প্রতি সাত সেকেন্ডে একজন মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে। ধারণা করা হয়, বিশ্বে প্রতি ১১ জনের মধ্যে একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।

প্রায় ৯৫ শতাংশ রোগী টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশের কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে প্রতি পাঁচ সেকেন্ডে একজন মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে। প্রতি ১০ সেকেন্ডে একজন মারা যাচ্ছে আর প্রতি ৩০ সেকেন্ডে একজনের পা কাটতে হচ্ছে।

রোগীর সংখ্যাধিক্যের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ১০ টি দেশের অন্যতম। এদেশে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা যেমন বেশি, তেমনি ডায়াবেটিস বৃদ্ধির হারও বেশি।

বর্তমানে বাংলাদেশে মোট ডায়াবেটিস আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দেড় কোটি প্রায়। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির (বাডাস) এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০৪৫ সালের মধ্যে এ সংখা দ্বিগুণেরও বেশি হবে। কিন্তু আরো ভয়াবহ তথ্য হলো, ২০৪৫ সালে বাংলাদেশে ডায়াবেটিসজনিত মৃত্যু নবম অবস্থানে থাকবে। দেশের মানুষের আয়ুষ্কাল ৭৩ বছর হলেও ডায়াবেটিস রোগীর গড় আয়ুষ্কাল ৬৩ বছর।

ডায়াবেটিস একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। আগে থেকে সতর্ক থাকলে নীরব ঘাতক রোগটির হাত থেকে বাঁচা যায়। কিন্তু কোনো কারণে রোগটি হয়ে গেলে পুরোপুরি নিরাময় হয় না। তবে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বিশ্বে ২০১৯ সালে মানুষের মৃত্যুর নবম প্রধান কারণ ছিল ডায়াবেটিস। যার কারণে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে ১০০ জনের মধ্যে ২০ জন মহিলা গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, যাদের অর্ধেকের বেশি পরবর্তীকালে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন।  ডায়াবেটিক রোগীদের ৫ শতাংশ শিশু। এ হার প্রতিনিয়ত আরো বাড়ছে বলে দাবি করেছেন ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় নিয়োজিত একাধিক বিশেষজ্ঞ।

ডায়াবেটিস মহামারী আকারে বেড়েছে যেভাবে
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) অ্যান্ডোক্রাইনোলজি (ডায়াবেটিস ও হরমোন) বিভাগের এক প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে আশির দশকে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ছিল মাত্র ২ শতাংশ। তিন দশক পর এখন গ্রামাঞ্চলের প্রায় ১০ শতাংশ মানুষের শরীরে এ রোগের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সে হিসাবে তিন দশকে গ্রামাঞ্চলে প্রায় চারগুণ বেড়েছে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা। কেবল ১৮ বছরের বেশি বয়সীই নয়, গ্রামের শিশুদের মধ্যেও ডায়াবেটিস আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে।
ডায়াবেটিস রোগীর সুগার, রক্তচাপ ও রক্তের চর্বির নিয়ন্ত্রণ একসাথে খুব কমই থাকে। খোদ আমেরিকায় এ হার ২৬। বাংলাদেশের অবস্থা আরো শোচনীয়, ৪ শতাংশের নিচে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণে গ্রামের অধিবাসীরা এখন শহরের মতো প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন। সেই সাথে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তনে বৃদ্ধি পাচ্ছে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি। সচেতনতার অভাবে বাংলাদেশে যে হারে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, তাতে এটি স্বাস্থ্য খাতে এখন বিশাল বোঝা।

২০১৮ সালে দেশের সব উপজেলায় স্বাস্থ্য অধিদফতর পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, শহর ও গ্রামের মানুষের মধ্যে আক্রান্তের পার্থক্য খুব একটা নেই। শিক্ষিত কিংবা অল্পশিক্ষিত মানুষের মধ্যেও পাওয়া যায়নি। যাদের মধ্যে ধূমপান, অস্বাভাবিক জীবনযাপন ও শারীরিক পরিশ্রমের হার কম তাদের ডায়াবেটিসে আক্রান্তের হার বেশি।

তবে বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের (বিডিএইচএস) সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে যাদের বয়স তাদের মধ্যে যেখানে শহরে ১৪ শতাংশ নারী ডায়াবেটিসে আক্রান্ত সেখানে গ্রামে আক্রান্তের হার ৮ শতাংশ। একই সাথে, এই বয়সসীমায় গ্রামে ১০ শতাংশ পুরুষ ডায়াবেটিসে ভুগলেও শহরে ১৩ শতাংশ পুরুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।

গ্রামাঞ্চলে আগের তুলনায় কায়িক পরিশ্রম কমে যাওয়ায়ও ডায়াবেটিস বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। আর ডায়াবেটিস বৃদ্ধির কারণে বেশি ক্ষুধা পায়, ফলে বেশি খেয়ে খেয়ে শরীরের ওজন অতিমাত্রায় বেড়ে যায়। ডায়াবেটিস রোগীর সুগার, রক্তচাপ ও রক্তের চর্বির নিয়ন্ত্রণ একসাথে খুব কম থাকে। খোদ আমেরিকায় এ হার ২৬। বাংলাদেশের অবস্থা আরো শোচনীয়- ৪ শতাংশের নিচে। এ কারণে ডায়াবেটিস রোগীরা হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকে বেশি মারা যায়। ডায়াবেটিস রোগীর অন্ধ হওয়া, কিডনি নষ্ট হওয়ার মাত্রা অনেক বেশি। একজন ডায়াবেটিক রোগী যদি এক নাগাড়ে পাঁচ বছর ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ না করে তাহলে তাদের মধ্যকার প্রতি তিনজনের একজন ক্রনিক কিডনি ডিজিজে আক্রান্ত হয়ে আলটিমেটলি দুই কিডনি পুরোপুরি ড্যামেজের দিকে চলে যায়- অনিবার্য চিকিৎসা হয় ডায়ালাইসিস, না হয় কিডনি বদল। আমাদের দেশে সিসিইউ, আইসিইউ, ডায়ালাইসিস ও করোনায় আক্রান্ত রোগীর প্রায় অর্ধেক ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।’

ডায়াবেটিক সমিতির সেন্টার ফর গ্লোবাল হেলথ রিসার্চের সমন্বয়ক ডা: বিশ্বজিৎ ভৌমিক বলেন, ‘দেশে ৪২৬টি উপজেলায় এক লাখ মানুষের ওপর একটি জরিপ চালানো হয়। এতে দেখা যায়, প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলেও রোগী এ রোগ সম্পর্কে জানে না। যারা আক্রান্ত হচ্ছে তাদের ৪০ শতাংশের ওজন স্বাভাবিক থাকে। কায়িক পরিশ্রম কম হওয়া, অতিরিক্ত ওজন, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, কম হাঁটা-চলা ও গ্রামে যানবাহন ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় রোগী বাড়ছে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে মাত্র ১২ শতাংশ রোগীর ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আছে। যাদের ওজন বেশি, কায়িক পরিশ্রম কম করেন, দুশ্চিন্তায় আচ্ছন্ন থাকেন, বেশি রাত জাগেন, ফাস্ট ফুড, অতিভোজন, ধূমপান ও মদ্যপানে অভ্যস্ত- তাদের ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যাদের বাবা-মা, ভাইবোন বা ঘনিষ্ঠ আত্মীয় স্বজনদের ডায়াবেটিস রয়েছে, তাদের রোগটিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। এ ছাড়াও যাদের রক্তে চর্বির পরিমাণ বেশি, উচ্চরক্তচাপ আছে- তাদেরও এই রোগে আক্রান্তের আশঙ্কা বেশি।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের উপায়
দেশে প্রায় দেড় কোটি ডায়াবেটিস রোগী থাকলেও তাদের চিকিৎসায় মাত্র ১৫০ জন ডায়াবেটিস ও হরমোন বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। এ হিসাবে প্রতি ৬৬ হাজার রোগীর সেবায় চিকিৎসক মাত্র একজন। আর মোট জনসংখ্যার হিসাবে প্রতি ১২ লাখ মানুষের জন্য একজন ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ রয়েছেন।

নিয়ন্ত্রণ করার কারণে উন্নত দেশে ১০ শতাংশ হারে রোগী বাড়ছে আর আমাদের ক্ষেত্রে সেটি প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ হারে বেড়ে যাচ্ছে। সচেতনতা বৃদ্ধি ডায়াবেটিস থেকে বাঁচার আরেকটি বড় উপায়।

শুধু গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে রেখে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। এর সাথে প্রেসার ও লিপিড নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। কোনো ডায়াবেটিস রোগীর বয়স ৪০ বছর হলে, তার লিপিড লেভেল যাই থাকুক না কেন, তাকে ওষুধ দিতে হবে। আর যদি বয়স ৪০ বছরের কম হয় ও এলডিএল কোলেস্টেরল ১০০-এর বেশি হয়, তাহলে তাকে ওষুধ দিতে হবে। টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ মারা যায় হৃদরোগের কারণে। এ ছাড়া স্ট্রোকেও মারা যায় অনেকে। সুতরাং গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রেসার ও লিপিড নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, স্থূলতা কমাতে হবে এবং ধূমপান-মদ্যপান ছাড়তে হবে। আমাদের দৈনন্দিন পরিশ্রমের পর পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ডায়াবেটিস বেড়ে যায়। ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ঘুম কম হলে রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যায়।

মিষ্টি জাতীয় খাবার, ফাস্ট ফুড, জাঙ্ক ফুড, প্রক্রিয়াজাত খাবার, চাইনিজ ফুড, সব ধরনের মিষ্টি পানীয়, আচার ইত্যাদি এড়িয়ে চলতে হবে। নিয়মিত ব্লাড সুগার চেক করুন। এর পাশাপাশি সপ্তাহে দুই দিন রোজা রাখা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের ভালো উপায় হতে পারে।

লেখক : স্বাস্থ্যবিষয়ক নিবন্ধকার ও কলামিস্ট

মন্তব্য করুন

Logo

© 2022 Dinkal24 All Rights Reserved.