”এলএসডি” কি?

অতি সম্প্রীতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য বিজ্ঞান গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী হাফিজুর রহমান ব্রাক্ষ্মণবাড়ীয়া তার পরিবারের সাথে ঈদ-উল-ফিতর (১৪ মে ২০২১) উদযাপন করে ১৫ মে ২০২১ তারিখ সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজের অজুহাতে ঢাকায় ফেরত আসে। তারপর দীর্ঘ ০৮ দিন যাবৎ সে নিখোঁজ থাকার পর ২৩ মে ২০২১ তারিখে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে তার বন্ধু এবং পরবর্তীতে তার ভাই তাকে সনাক্ত করতে সক্ষম হয়। ঘটনার তদন্তে পুলিশের ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ উদঘাটন করে যে, গত ১৫ মে ২০২১ তারিখ আনুমানিক রাত :০০ ঘটিকায় হাফিজুর রহমান তার তিন সহপাঠি কার্জন হলের সামনে এলএসডি নামক মাদক সেবন করে এবং হাফিজুর রহমান ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনের ডাব বিক্রেতার দা দিয়ে নিজের গলা কেটে ফেলেন। এই ঘটনার সময় তিনি এলএসডির আসক্তিতে প্রভাবিত ছিলেন। ২৬ মে ২০২১ ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ হাফিজুরের তিন বন্ধুকে এলএসডির ২০০ টি ব্লটেট পেপারসহ গ্রেফতার করে। পরবর্তীতে ২৯ মে আরও পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় র‌্যাব ২৬ জুন ২০২১ তারিখে আরও চার ব্যক্তিকে এলএসডির ৪০ টি ব্লটেট পেপারসহ গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদেরকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় বিগত চার বছর ধরে নেদারল্যান্ড থেকে সরকারি পোস্টাল সার্ভিসের মাধ্যমে ড্রাগটি বাংলাদেশে আসছে।
কি এই এলএসডি যা সেবনের ফলে আসক্ত ব্যক্তি নিজেই নিজের গলা কেটে ফেলে আত্মহত্যা করে? তাহলে কেনই বা মানুষ জেনে শুনে এটি সেবন করে? কি হয় এটি সেবন করলে?এরুপ নানা প্রশ্নের উত্তরের অনুসন্ধানে এলএসডি সম্পর্কে জানার প্রেরণা প্রকাশ করেন র‌্যাব ৩ এর পরিচালক লেঃ কর্নেল রকিবুল হাসান, পিএসসি।             লেঃ কর্নেল রকিবুল হাসান, পিএসসি


এলএসডির ইতিহাস, এটি ব্যবহারের প্রভাব, এলএসডির সনাক্তকরণ, বাংলাদেশে এটির বিরুদ্ধে কার্যকরী ব্যবস্থা প্রভৃতি বিষয়াদির বর্নণা দেন তার লেখায়।


এলএসডির ইতিহাস  

সুইজারল্যান্ডের বিজ্ঞানী এলবার্ট হফম্যান ১৯৩৮ সালে লিসেরজিক অ্যাসিড থেকে প্রথম এলএসডি (লিসেরজিক অ্যাসিড ডায়েথ্যালামাইড) আবিষ্কার করে। তিনি রায় নামক শস্যর উপর ছড়িয়ে থাকা ইরগট নামক ছত্রাককে রাসায়নিক বিশ্লেসনের মাধ্যমে এলএসডি প্রস্তুত করেন। ১৯৫০ এবং ১৯৬০ এর দশকে মানসিক রোগের চিকিৎসার জন্য রিসার্চের অংশ হিসেবে এই এলএসডি ব্যবহƒ হতো। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায় এলএসডির ব্যবহার মানুষের জন্য ক্ষতিকারক। ১৯৭১ সালে এলএসডির  ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের জন্য জাতিসংঘের, ইল্লিসিট ট্রাফিক ইন নারকোটিকস ড্রাগ এন্ড সাইকোট্রাপিক সাবস্টেনসেস, একটি কনভেনশন করে যা সাইকোট্রপিক সাবস্টেনসেস ১৯৭১ নামে পরিচিত। বর্তমানে চিকিৎসার জন্য এই এলএসডি ব্যবহার বিশ্ব জুড়ে অননুমোদিত।

এই ড্রাগটি এতই শক্তিশালী যে, এক মাইক্রোগ্রামই এক থেকে চারজন ব্যক্তির শরীর মনে সাংঘাতিক প্রভাব বিস্তার করে। এলএসডি স্ফটিক আকারে উৎপাদিত হয়, এটি গন্ধহীন, বর্ণহীন এবং কিছুটা তেতো স্বাদ রয়েছে। বিভিন্ন দেশে এটি এলএসডি, অ্যাসিড, ব্লটার, ডোজ, ডটস, ট্রিপস, মেলো ইয়েলো, উইন্ডো পেনসহ ৮০ টিরও বেশি কথিত নামে বিক্রি হয়। এটি জেলটিন, ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, চিনির কিউব, গ্যামি চকলেট, বিস্কুটসহ বিভিন্ন আকারে ব্যবহার করলেও ব্লটিং পেপারে বিভিন্ন নকশার মতো করে বেশি ব্যবহৃত হয়ে থাকে।


এলএসডি ব্যবহারের প্রভাব

এলএসডি একটি মন পরিবর্তনকারী ড্রাগ। মস্তিষ্কের সেরোটোনিন একটি অংশ যা মানুষের আচরণ, মেজাজ নিয়ন্ত্রন, জ্ঞান এবং চিন্তাগুলি পরিচালনা করে থাকে। এলএসডি মস্তিষ্কের এই  সেরোটোনিনকে প্রভাবিত করে। মস্তিষ্কের চেতনা তৈরীকারী  স্নায়ুর সাথে এই ড্রাগের বিরুপ প্রভাব রয়েছে। যার ফলে মানুষ তার চিন্তাধারা হতে বিভিন্ন সময়ে অমূলক শব্দ বা প্রতিচ্ছবি প্রত্যক্ষ করে যাকে হ্যালুসিনোশন বলা হয়ে থাকে।বস্তুত এটি ব্যবহারের ফলে প্রার্থীব জীবনের উপরে উঠে গিয়ে কল্পনার জগতে ভাসতে থাকে, যেখানে সে তার ব্যক্তিগত চিন্তাধারা, পূর্বের অভিজ্ঞতা, সমসাময়িক সময়ের বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহের প্রভাবে প্রভাবান্তিত হয়।সাধারনভাবে ১৮-৩০ বছরের তরুণদের মধ্যেই এই ড্রাগ গ্রহণের প্রবণতা বেশি।

এর প্রভাবগুলি প্রায়শইট্রিপনামে পরিচিত। এটি উত্তেজক এবং আনন্দদায়ক হতে পারে, যাকেগুড ট্রিপএবং এটি অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রীতিকর হতে পারে যাব্যাডট্রিপনামে পরিচিত। এলএসডি ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির উপর ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব বিস্তার করে, তাই গ্রহণের পূর্বে কোন ব্যক্তি নিশ্চিত হতে পারে না এটি তার শরীরে কোন ধরনের প্রভাব ফেলবে। অনেকের ক্ষেত্রে এটি একটি দূঃস্বপ্নের মতো, যা থেকে ব্যক্তি ততক্ষণ স্বাভাবিক হতে পারে না, যতক্ষণ তার শরীরে এলএসডির প্রভাব থাকে। সাধারনত এর স্থায়ীত্বকাল -১২ ঘন্টা হয়ে থাকে। কোন ব্যক্তি খারাপ ভাবে আক্রান্ত হলে কোন ধরনের ঔষধ প্রয়োগ করে তাকে স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়। অনেক গ্রহণকারীই তাদের ভৌতিক অভিজ্ঞতার কথা বিভিন্ন মাধ্যমে জানিয়েছেন। এছাড়াও অনেকের ক্ষেত্রে, এই ড্রাগটি একবার গ্রহণের ফলে তাদেরকে চরম পর্যায়ের মৃত্যুর ভয় আছন্ন করে ফেলে। আমাদের দেশেও কিছু ব্যক্তিবর্গ আইন-শৃংখলা রক্ষা বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন যে, তারা মাত্র একবার এলএসডি গ্রহণ করেছিলো এবং দ্বিতীয়বার গ্রহণ করার মতো শারীরিক মানসিক সাহস তাদের নেই। তারা ভয়ংকর মানসিক সমস্যায় ভূগছেন এবং আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। নিয়মিত এলএসডি সেবনে গ্রহণকারী ব্যক্তিরা নিজেদের বোধ শক্তি হারিয়ে ফেলে এবং নিজেদেরকে শারীরিকভাবে জখম করে, ক্ষেত্র বিশেষে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। একটি পরিসংখ্যানে ২০১১ সালে শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রে ৫০০০ ব্যক্তি এলএসডি গ্রহণ করে চরম পর্যায়ের মানসিক সমস্যা নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্ভি হয়েছেন। নিশ্চিত ভাবে বলা যায়, বিগত ১০ বছর পর এই সংখ্যাটি অনেকাংশেই বেড়েছে।

বিশ্বে সনামধন্য কিছু সাংস্কৃতিক ব্যক্তি, লেখক, ব্যবসায়ীরা এলএসডি গ্রহণের সুফল ব্যক্ত করেছেন। তাদের বক্তব্য শুনে অনেকে এলএসডি গ্রহণে উৎসাহিত হতে পারেন। তারা মনে করছন এলএসডি গ্রহণে ব্যক্তি অধিক সৃষ্টিশীল বা উদ্ভাবনী শক্তি বৃদ্ধি করতে সক্ষম। পক্ষান্তরে এলএসডি ব্যবহার করে আত্মহত্যার ঘটনা, প্রচন্ড রকম মানসিক রোগে আক্রান্ত্রের সংখ্যা অসংখ্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হাফিজুরের আত্মহত্যার ঘটনা পর্যালোচনা করলেই এর বাস্তবতা বোঝা যায়।


এলএসডির সনাক্তকরণ

গবেষকরা এলএসডি সনাক্তকরণের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি বিকাশের চেষ্টা করছেন। এলএসডি ব্যবহারের ০৮ ঘন্টার মধ্যে সাধারণত প্রস্রা পরীক্ষায় সনাক্ত করা যায়। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে এলএসডি সনাক্ত করা সম্ভব। এলএসডি আসক্ত ব্যাক্তির চুলের ফলিসাইল পরীক্ষার মাধ্যমেও সনাক্ত করা যায়।


বাংলাদেশে এলএসডির বিরুদ্ধে কার্যকরী ব্যবস্থা

বাংলাদেশে এই ড্রাগ খুব সম্প্রতিকালে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক সনাক্ত করা হলেও ধারণা করা হচ্ছে এটি বিগত কয়েক বছর ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে। এলএসডি সেবনে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিবর্গরা এটাও স্বীকার করেছেন যে, দীর্ঘদিন অন্য মাদক আসক্তির কারনে তাদের শরীরে মাদকের প্রতিক্রিয়া কমে যায়। ফলস্রূতিতে আরো অধিক প্রতিক্রিয়াশীল মাদক এলএসডি সেবনে তারা প্রলুব্ধ হয়। অনেকেই কৌতুহল বশত এই সকল ড্রাগের মরণ ফাঁদে পা বাড়াচ্ছে। নতুন মাদকদ্রব্য সম্পর্কে অজ্ঞতা এর বিস্তারে ভূমিকা রাখছে। এলএসডি যেহেতু গন্ধহীন একটি মাদক, তাই অনেক ক্ষেত্রেই পরিবারের অন্যান্য সদস্যবৃন্দ মাদকসেবীকে চিহিৃত করতে পারে না। এছাড়াও বিদেশে কর্মরত বা শিক্ষারত অনেক তরুণই দেশী বন্ধুদের প্ররোচনায় বিদেশ থেকে মাদকটি বহন করে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। তারা অনেকেই জানেন না এই মাদকের পরিবহন এবং ব্যবহার বিশ্বের অনেক দেশের মতো আমাদের দেশেও নিষিদ্ধ। তাই ব্যক্তি সচেতনতার কোন বিকল্প নেই। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে এলএসডি ব্যবহারকারীদের গ্রেফতারের সময় দেখা গেছে, এদের মধ্যে বেশির ভাগই উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য। গ্রেফতারকৃত তরুনদের কারনে সকল স্বনামধন্য পরিবার সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছেন এবং গ্রেফতারকৃত তরুণদের ভবিষ্যৎ পেশা জীবনও মারাত্মকভাবে ক্ষতির মূখে পড়ছে। তাই পারিবারিকভাবে সকলকেই সচেতন হতে হবে, যেন তাদের কোন সদস্য এই ভয়ানক মাদকে আসক্ত না হয়। মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে শুধুমাত্র আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকাই যথেষ্ঠ নয়। মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজসহ সকলকে একসাথে কাজ করতে হবে।

ধর্মীয়, পারিবারিক এবং সামাজিক শিক্ষার মাধ্যমে আমাদের এই তরুণ প্রজন্মকে মাদকের মরণ ফাঁদ থেকে ফিরিয়ে আনতে হবে। মাদক সেবনকারী ব্যক্তিদেরকে পারিবারিকভাবে নিবিড় পর্যবেক্ষনের মধ্যে রেখে তাদেরকে এই পথ থেকে সরিয়ে আনা সম্ভব। মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা অনেক সময় খুবই সংবেদনশীল হয়ে থাকে, তাদের মানসিক অবস্থার উন্নতির জন্য চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এছাড়াও মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের তুচ্ছতাচ্ছিল্ল না করে তাদের জন্য সুস্থ স্বাভাবিক পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে তাদের পরিবারের ভূমিকাই প্রধান। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি তার সম্পূর্ণ পরিবারকে ধ্বংস করে ফেলতে পারে। দৈনন্দিন মাদকের চাহিদা পূরণের জন্য তাদের অর্থের প্রয়োজন হয়। পারিবারিকভাবে অর্থ জোগাড় করতে না পারলে তারা ছিনতাই, চুরি এবং মাদক বিক্রির মতো ভয়ানক অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুণদেরও দেখা গেছে এই ছকে পড়ে সামাজিক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাই পারিবারিকভাবে তরুণদের মূল্যবোধের শিক্ষা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের তরুণ সদস্যদের দৈনন্দিন কার্যক্রম এবং বন্ধু মহল সম্পর্কে পরিবারের সদস্যদের প্রতিনিয়ত তদারকি করা প্রয়োজন। এছাড়াও সামাজিকভাবে এই সকল অপরাধকে প্রতিহত করতে হবে। সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গদের এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে। মাদক সংক্রান্ত তথ্য নিজেদের গোচরে আসলে, তা দ্রুত আইন-শৃংখলা বাহিনীকে আবগত করতে হবে। যদিও এলএসডি বাংলাদেশে এখনো বহুল প্রচলিত মাদক নয়, তথাপি এখনি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে তা ভয়াবহ রুপ নিতে পারে। তাই পারিবারিক, সামাজিক এবং আইন-শৃংখলা বাহিনীর সম্মন্নিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে দেশের তরুণ সমাজকে এই ভয়ানক মাদক থেকে দূরে রাখতে হবে।




মন্তব্য করুন

Logo

© 2021 Dinkal24 All Rights Reserved.