প্রতারণার টাকায় ঢাকায় চার বাড়ি

নির্দিষ্ট কোনো পেশা নেই তাঁর। কখনও বাংলাদেশি শিল্পপতি, কখনও ভারতের বড় ব্যবসায়ী পরিচয় দেন। নানাভাবে ফাঁদ পেতে নিরীহ মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। রাজধানীর পল্লবী এলাকায় চারটি বাড়ির মালিক তিনি। এ ছাড়াও নামে-বেনামে রয়েছে বহু সম্পদ। এই প্রতারক হলেন কবির ওরফে মিজান উকিল। গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরে।

মিজানের বিরুদ্ধে সাতটি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন তিনি। কিছুদিন কারাভোগ করে জামিনে বেরিয়ে ফের প্রতারণায় মেতে ওঠেন। দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় তাঁর প্রতিনিধি আছে। তাঁরা নিরীহ মানুষদের ফুসলিয়ে ঢাকায় মিজানের কাছে নিয়ে আসেন। কারও কাছে ক্লিনিক ব্যবসার কথা বলে, কারও ভবনের ছাদে নেটওয়ার্কের টাওয়ার বানানোর কথা বলে কিংবা তিন তাসের খেলার ছলনায় টাকা হাতিয়ে নেন তাঁরা।
পল্লবী থানা এলাকার সবুজ বাংলা আবাসিক এলাকা, আদর্শ নগর এবং ৫৪ নম্বর প্লট এলাকায় আছে মিজানের চারটি বাড়ি। গত ২৩ ডিসেম্বর ওই এলাকায় গিয়ে মিজানের কথা জিজ্ঞাসা করতেই অনেকে বিরূপ মন্তব্য করেন। তাঁরা জানান, মিজানের একটি সংলাপ এলাকায় খুব প্রচলিত। তিনি দাম্ভিকতার সঙ্গে বলেন, 'শরীয়তপুর থেকে আইছি একখান কাঁথা নিয়া, এখন চারখান কম্বল নিয়া ঘুমাই।' নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিন বাসিন্দা জানান, মিজান এক সময় এলাকায় ভাড়াটে ছিলেন। অবৈধ টাকায় এসব বাড়ি গড়েছেন।

মিরপুরের ১১ নম্বর সেকশনে 'ই' ব্লকের ১৪ নম্বর লেনের ১০ নম্বর হোল্ডিংয়ে দোতলা বাড়িতে সপরিবারে বাস করেন মিজান। বাড়ির নিচে কয়েকটি দোকানঘর করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। বাড়ির পাশের কয়েকজনের কাছে তাঁর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতেই একজন সিসি ক্যামেরা দেখিয়ে বলেন, মিজানের বাড়ির চারপাশে ক্যামেরা স্থাপন করা। নানা অপরাধে জড়িত থাকার কারণে তাঁর বাসার আশপাশে কে অবস্থান করছে, তা পর্যবেক্ষণ করেন তিনি। সিসি ক্যামেরার সঙ্গে তাঁর মোবাইল ফোনের সংযোগ আছে।
সর্বশেষ উত্তরা পশ্চিম থানায় লুৎফুর রহমান নামে এক ভুক্তভোগীর দায়ের করা মামলায় গত ১১ নভেম্বর মিজান ও তাঁর স্ত্রীসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
লুৎফুর রহমানের বাড়ি বগুড়া জেলায়। ক্লিনিকের ব্যবসা করার কথা বলে মিজান ও তাঁর সহযোগীরা ৯০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন তাঁর কাছ থেকে। এ অভিযোগে তিনি গত ১০ নভেম্বর উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা করেন। এ ছাড়াও রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় আরও দুটি, মিরপুর মডেল থানায় একটি, দারুস সালাম থানায় একটি এবং ভোলা সদর থানায় একটি মামলা রয়েছে মিজানের বিরুদ্ধে। ঢাকার আদালতেও একটি মামলা করেছেন এক ভুক্তভোগী।

ভুক্তভোগীদের একজন আব্দুল হালিম। তাঁর বাড়ি কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের বড়চাঁদপুর গ্রামে। ৩২ বছর বিদেশে কাটিয়ে ২০২০ সালে দেশে আসেন। তিনি বাস করেন ঢাকায়। হালিম সমকালকে জানান, নোয়াখালী জেলায় বাংলাবাজারে একটি দোকানঘর রয়েছে তাঁর। সেটি ভাড়া দেওয়া। ২০২১ সালের ২৭ আগস্ট রুবেল হোসেন নামে ভোলা জেলার এক যুবক ওই দোকানে যান। দোকানি দেলোয়ার হোসেনকে বলেন ছাদের ওপর নেটওয়ার্ক টাওয়ার বসাতে চান তাঁরা। বড় অঙ্কের টাকার প্রলোভন দেখিয়ে আব্দুল হালিমের ফোন নম্বর নেন রুবেল। পরদিন জাহিদুল নামে একজন হালিমকে ফোন দিয়ে বলেন, উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের ৭ নম্বর সড়কের ৬৩ নম্বর বাড়িতে তাঁদের অফিস। তাঁরা প্রতিটি জেলায় নেটওয়ার্ক টাওয়ার বসাবেন। তাঁর দোকানে টাওয়ার বসানের প্রস্তাব দিয়ে অফিসে ডাকেন তাঁকে। ৩০ আগস্ট সেখানে যান হালিম। ১০ বছরের চুক্তিতে অগ্রিম হিসেবে ২৪ লাখ টাকা এবং প্রতি মাসে ৪০ হাজার টাকা ভাড়া দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হয় তাঁকে। এসব কথা হয় মিজানের সহযোগী রাশেদ খান বাবুসহ কয়েকজনের সঙ্গে। রাজি হয়ে হালিম ফিরে যান বাসায়। ২ সেপ্টেম্বর আবার ডাকা হয় তাঁকে। ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে কথা হয় মিজানের সহযোগী রাশেদ, ফখরুল, আব্দুর রহমানের সঙ্গে। তাঁরা হালিমকে প্রলোভন দেখান, মিজান উকিল নামে একজন ভারতীয় মেডিসিন ব্যবসায়ী তাঁদের ঘনিষ্ঠ। তাঁর অনেক টাকা আছে। তিন তাস খেলে তাঁকে হারিয়ে টাকাপয়সা হাতিয়ে নিতে হবে। কথা বলার সময়ই মিজানকে অফিসে হাজির করা হয়। এক পর্যায়ে আয়োজন করা হয় তিন তাস খেলার। মিজান তাঁদের কাছে সাড়ে ৪ কোটি টাকা হেরে যান। এর পর মিজান একটি ব্যাগ দেখিয়ে বলেন, এতে সাড়ে ৪ কোটি টাকা আছে। যেহেতু জুয়া খেলা, তাই সমপরিমাণ টাকা দেখিয়ে টাকা নিতে হবে। মিজানের সহযোগীরা জানান, তাঁদের কাছে এ মুহূর্তে সাড়ে ৩ কোটি টাকা আছে। বাকি ১ কোটি টাকা জোগাড় করতে হবে। প্রস্তাব দেন হালিমকে ১ কোটি টাকা জোগাড় করে দিলে বিনিময়ে ৮১ লাখ টাকার লাভ দেওয়া হবে। প্রলোভনে পড়ে ৪ দফায় ৭৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেন তিনি। ১৭ অক্টোবর চক্রের সদস্য রাশেদ ফোন করে মিজানকে জানান, তাঁরা সবাই পুলিশ হেফাজতে। পরে হালিম অফিসে গিয়ে দেখেন, তালা ঝুলছে। এ ঘটনায় হালিম আদালতে মামলা করেন।

ডিবির ওয়ারী বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার মাহফুজুর রহমান বলেন, প্রতারক চক্রটির মূল হোতা মিজান। গুলশান-উত্তরা এলাকায় দামি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে অফিস বানিয়ে প্রতারণা করেন তাঁরা।

মন্তব্য করুন

Logo

© 2023 Dinkal24 All Rights Reserved.