স্কুলে স্কুলে গলাকাটা ভর্তি ফি আদায়

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুসারে এবার ঢাকা মহানগরীতে বাংলা মাধ্যম স্কুলে ভর্তি ফি সর্বোচ্চ ৮ হাজার টাকা; ইংরেজি মাধ্যমে ১০ হাজার টাকা। তবে তা শুধু নীতিমালাতেই সীমাবদ্ধ। রাজধানীতে এমন প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাওয়া কঠিন, যেখানে এই টাকায় ভর্তি হওয়া সম্ভব।

শুধু ভর্তি ফি নির্ধারিত হারে আদায় করা হলেও, এর সঙ্গে উন্নয়ন ফি, সেশন ফিসহ নানা কিছু জুড়ে দিয়ে নেওয়া হয় অনেক বেশি টাকা। কিছু বিদ্যালয় আবার মার্চ পর্যন্ত বেতনও ভর্তির সময় আদায় করছে। সব মিলিয়ে সন্তান ভর্তি করতে গিয়ে অভিভাবকদের নাভিশ্বাস উঠছে।
এ বছর নৈরাজ্য বন্ধে ঢাকা মহানগরীর জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় চারটি এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর ১৬টি মনিটরিং কমিটি গঠন করে। সারাদেশের জন্য মোট ৫৫টি মনিটরিং টিম গঠন করা হয়। তবে তিন দিনের ভর্তি কার্যক্রমের শেষ দিনে এসব টিম গঠন করায় ততক্ষণে অভিভাবকদের পকেট কাটার কাজ সম্পন্ন করে ফেলে নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মনিটরিং কমিটিগুলো প্রতিবেদন এরই মধ্যে জমা দিয়েছে। এসব কমিটি সরেজমিন 'গলাকাটা ফি' আদায়ের প্রমাণ পেয়েছে। তবে এখনও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আবু বকর ছিদ্দীক গত সোমবার সমকালকে বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠান বাড়তি ফি নিলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানীসহ সারাদেশের নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিবারই শিক্ষাবর্ষের শুরুতে ভর্তি, টিউশন, সেশন ফি, বেতন ও এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করে। রাজধানীর ১৬টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রায় প্রতিবছর এ অভিযোগ ওঠে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সাউথপয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ, গ্রিনফিল্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজ, হোপ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, চেতনা মডেল একাডেমি, মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউট, বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শহীদ আনোয়ার গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, প্রিপারেটরি গ্রামার স্কুল, কসমো স্কুল, ডেমরার সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বনফুল গ্রিনহার্ট আদিবাসী কলেজ, এস ও এস হারম্যান মেইনার কলেজ এবং শহীদ পুলিশ স্মৃতি স্কুল অ্যান্ড কলেজ।
মন্ত্রণালয়ের নীতিমালায় বলা আছে, 'সেশন চার্জসহ ভর্তি ফি সর্বসাকল্যে মফস্বল এলাকায় ৫০০ টাকা, পৌর উপজেলা এলাকায় ১ হাজার টাকা, পৌর (জেলা সদর) এলাকায় ২ হাজার টাকা, ঢাকা ব্যতীত অন্যান্য মেট্রোপলিটন এলাকায় ৩ হাজার টাকার বেশি হবে না। বাস্তবে দেখা গেছে, দেশের বেশিরভাগ স্কুলই এ নীতিমালা মানেনি।

১৯ থেকে ২১ ডিসেম্বর তিন দিন স্কুলে ভর্তি কার্যক্রমের শেষ দিনে ভর্তি ফি বেশি নেওয়ার অভিযোগ তদন্তে মনিটরিং টিম গঠন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। চারজন উপসচিবের নেতৃত্বে চারটি মনিটরিং কমিটি করা হয়। নীতিমালা অনুযায়ী ফি আদায় করছে কিনা, তা যাচাইয়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেছে এসব কমিটি। ঢাকা মহানগরীর মোট ১৬টি মনিটরিং কমিটি, আটটি বিভাগীয় মনিটরিং কমিটি, ৫৫টি জেলা মনিটরিং কমিটি জেলা সদরের এবং উপজেলা মনিটরিং কমিটি উপজেলার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মনিটরিং করে মাউশি অধিদপ্তরে রিপোর্ট জমা দিয়েছে।

এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু সমকালকে বলেন, ভর্তির পরে পরিদর্শন করে কী লাভ হবে? অভিভাবকদের পকেট কাটা তো শেষ। কমিটিগুলো আগেই করা হলে ভর্তির আগে অভিভাবকদের অভিযোগ দেওয়ার সুযোগ থাকত।

রাজধানীর মনিটরিং কমিটি-১-এর দায়িত্ব ছিল মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, গ্রিনফিল্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজ, হোপ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, চেতনা মডেল একাডেমি এবং মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউট মনিটরিং করা। এ কমিটির প্রধান মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের উপসচিব মো. মিজানুর রহমান সমকালকে বলেন, তাঁরা সব প্রতিষ্ঠানে গিয়েছিলেন। বেশি টাকা আদায়ের প্রমাণও পেয়েছেন। গ্রিনফিল্ড স্কুলে ভর্তিতে বাড়তি টাকা নেওয়া হয়েছে। মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউট পুরোনো শিক্ষার্থীদের ভর্তিতে শ্রেণিভেদে ৭ হাজার ৮০০, ৭ হাজার ৪০০, ৭ হাজার ৩০০ টাকা নিচ্ছে। ভর্তি নীতিমালা অনুসারে তারা তা করতে পারে না। কারণ পুরোনো শিক্ষার্থীদের নতুন করে ভর্তি হতে হবে না। প্রতিষ্ঠানটি নতুন শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে শ্রেণিভেদে ৮ হাজার ৮০০, ৮ হাজার ৬০০, ৮ হাজার ৪০০ টাকা করে নিচ্ছে। মিজানুর রহমান জানান, তাঁরা যা পেয়েছেন, সে প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছেন।

মনিটরিং কমিটি-২-এর দায়িত্ব ছিল বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শহীদ আনোয়ার গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, প্রিপারেটরি গ্রামার স্কুল এবং কসমো স্কুলে। এ কমিটির প্রধান উপসচিব আবু সাঈদ মো, ফজলে এলাহী। কমিটির সদস্য মাউশির উপপরিচালক (মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন) সেলিনা জামান জানান, ২১ ডিসেম্বর দুপুরে তাঁরা বনানী বিদ্যানিকেতনে যান। প্রতিষ্ঠানটি বাংলা মাধ্যমে ভর্তিতে ৮ হাজার টাকা করে নিলেও কৌশলে আনুষঙ্গিক খাতে আরও বেশি টাকা নিচ্ছে। বাড়তি টাকা আদায়ের সরকারি পরিপত্র দেখতে চাওয়া হয় প্রতিষ্ঠানপ্রধানের কাছে। তিনি জানান, পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তে টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। অথচ এটি তারা করতে পারে না। তিনি সেই সিদ্ধান্তের যে রেজুলেশন দেখিয়েছেন, সেটিও বহু পুরোনো। মনিটরিং কমিটি-৩-এর দায়িত্ব ছিল ডেমরার সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজ মনিটরিং করা। এ কমিটির প্রধান উপসচিব ড. মো. ফরহাদ হোসেন সমকালকে বলেন, তাঁরা প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শনে গিয়ে পাওয়া সব তথ্যসহ প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছেন।

মনিটরিং কমিটি-৪-এর দায়িত্ব ছিল মিরপুরের বনফুল গ্রিনহার্ট আদিবাসী কলেজ, এস ও এস হারম্যান মেইনার কলেজ এবং শহীদ পুলিশ স্মৃতি স্কুল অ্যান্ড কলেজ মনিটরিং করা। কমিটির প্রধান উপসচিব মো. আব্দুল্লাহ আল মাসউদ বলেন, 'তদন্তে কী কী পেয়েছি, তা বলা সম্ভব নয়। তবে বাড়তি টাকা নেওয়া হয়েছে, এটুকু বলতে পারি।'

মন্তব্য করুন

Logo

© 2023 Dinkal24 All Rights Reserved.