শান্তিপূর্ণ সমাবেশে কঠোর বার্তা

দেশজুড়ে উত্তেজনার পারদ আর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার অবসান ঘটেছে। নানা নাটকীয়তা, সংঘাত, শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার ও বাধা ডিঙ্গিয়ে গতকাল শনিবার রাজধানী ঢাকায় শান্তিপূর্ণ বিভাগীয় গণসমাবেশ শেষ করেছে বিএনপি। মাসজুড়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মধ্যে বাগ্‌যুদ্ধ চললেও শেষ পর্যন্ত দু'একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া বড় কোনো বিশৃঙ্খলা হয়নি। এমনকি নগরজুড়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীর মহড়ার মধ্যে বিএনপি নেতাকর্মীরা সমাবেশে যোগ দিলেও সংঘাতের খবর পাওয়া যায়নি। তাছাড়া নিরাপত্তা রক্ষায় রাজধানীজুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ছিল সজাগ চোখ।

এদিকে একাদশ জাতীয় সংসদের মেয়াদ এক বছর বাকি থাকতেই এই সমাবেশ থেকে একযোগে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপির সাত সংসদ সদস্য। বিষয়টি সংসদীয় গণতন্ত্র চর্চায় নতুন ইস্যু তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা। এর ফলে রাজধানীর গোলাপবাগের বহুল আলোচিত এই গণসমাবেশ রাজনৈতিক অঙ্গনে 'টার্নিং পয়েন্ট' হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

একই সঙ্গে সমাবেশ থেকে 'গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার' দাবিতে ১০ দফা ঘোষণা করেছে রাজপথের এই প্রধান বিরোধী দলটি। দফাগুলোর সঙ্গে ঐক্যমত পোষণ করে সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোকেও নিজ নিজ মঞ্চ থেকে যুগপৎ আন্দোলনে শামিল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসসহ বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার ও একজনের মৃত্যুর প্রতিবাদে ঢাকাসহ বিভাগীয় মহানগর ও জেলা সদরে আগামী ১৩ ডিসেম্বর বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল এবং ঘোষিত ১০ দফা দাবিতে ২৪ ডিসেম্বর গণমিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি।

সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, আমাদের দাবিগুলো জনগণের দাবি। অবিলম্বে নির্দলীয় সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে।

আগামী সংসদ নির্বাচনের এক বছর আগে সরকার পতনে আন্দোলনের কর্মসূচি দিতে ঢাকায় এই গণসমাবেশ ডাকে বিএনপি, যা নিয়ে কয়েকদিন ধরেই উত্তপ্ত রাজনীতির মাঠ। বিএনপির মধ্যম সারির নেতারা বলেছিলেন, ১০ ডিসেম্বরের পর দেশ চলবে খালেদা জিয়ার নির্দেশে। এর পর থেকে ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও বিএনপি নেতাদের মধ্যে শুরু হয় কথার লড়াই, হুমকি-পাল্টা হুমকি। উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে বিএনপি নয়াপল্টনে এই সমাবেশ করতে চাইলেও পুলিশ তাতে সায় দেয়নি। এরই মধ্যে গত বুধবার নয়াপল্টনে জড়ো হওয়া দলটির নেতাকর্মীর ওপর চড়াও হয় পুলিশ। সেদিন সংঘর্ষে একজন নিহতও হন। এর পর বিএনপির কার্যালয়ে পুলিশ অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতাসহ কয়েকশ নেতাকর্মীকে ধরে নিয়ে যায়। পরদিন বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসকে। এর পর নানা নাটকীয়তার মধ্যে বিএনপিকে গোলাপবাগ মাঠে সমাবেশের অনুমতি দেয় পুলিশ; তবে সেই সমাবেশে যোগ দিতে আসা নেতাকর্মীকে বিভিন্নভাবে সরকার বাধা দিয়েছে বলে অভিযোগ দলটির। একই সঙ্গে এ সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হলো বিএনপির বিভাগীয় ১০ গণসমাবেশ। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, সারাদেশের নেতাকর্মীকে হত্যা, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে গত ১২ অক্টোবর থেকে এ গণসমাবেশ শুরু করে বিএনপি।

সমাবেশ থেকে বিএনপির এমপিরা বলেন, দলীয় সিদ্ধান্ত অনুসারে তাঁরা পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দিয়েছেন। ৩৫০ আসনের সংসদে বিএনপির সাত সংসদ সদস্য হলেন- উকিল আবদুস সাত্তার (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২), হারুনুর রশীদ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩), জি এম সিরাজ (বগুড়া-৭), আমিনুল ইসলাম (চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২), জাহিদুর রহমান (ঠাকুরগাঁও-৩), মোশাররফ হোসেন (বগুড়া-৪) ও ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা (সংরক্ষিত নারী আসন)। এদের মধ্যে হারুন রয়েছেন বিদেশে। তিনিও পদত্যাগপত্রে সই করে পাঠিয়েছেন বলে জানানো হয়।

২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গড়ে ভোটে অংশ নিয়েছিল। সেই নির্বাচনে বিএনপির ছয়জন বিজয়ী হন, পরে সংরক্ষিত নারী আসনের একটি পায় দলটি। নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ তুলে শুরুতে বিএনপি জানিয়েছিল, তারা সংসদে যাবে না। পরে সিদ্ধান্ত বদলে শপথ নেন দলটির সংসদ সদস্যরা। চার বছর পর সরকারবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে সংসদ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল বিএনপি।

বক্তারা যা বললেন: ৯ বিভাগীয় গণসমাবেশের মতো ঢাকায়ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের জন্য চেয়ার ফাঁকা রাখা হয়। সকাল সোয়া ১০টায় কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় সমাবেশ। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, গণতন্ত্র হত্যাকারী, দেশের সম্পদ লুণ্ঠনকারী ও কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন অত্যাসন্ন। দেশ রক্ষায় সরকারের পতন অনিবার্য। ইতোমধ্যেই অবৈধ সরকারের ভেতরে পতন আতঙ্ক শুরু হয়েছে। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত আগামী জাতীয় নির্বাচনে জনতার সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে।

ড. মোশাররফ আরও বলেন, সমাবেশ যাতে সফল হতে না পারে, সে জন্য বিএনপির মহাসচিবসহ নেতাদের গ্রেপ্তার করেছে। একটি রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে এভাবে হামলার ঘটনা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীও করেনি।

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার বলেন, আওয়ামী লীগের কাছে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা হচ্ছে- ফর দ্য আওয়ামী লীগ, বাই দ্য আওয়ামী লীগ।

স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, তাঁরা প্রতিটি খেলায় জয়লাভ করেছেন। সড়কে সমাবেশ করলে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হবে- এমন অজুহাতে নয়াপল্টনে অনুমতি দেওয়া হয়নি। কিন্তু এখন তারাই (প্রশাসন) গত পাঁচ দিন ধরে পুরো নয়াপল্টন অবরুদ্ধ করে রেখেছে। এতে জনদুর্ভোগ হচ্ছে না?

স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, জনগণই সব ক্ষমতার উৎস। পুলিশের বুলেট দিয়ে ও বিএনপির অফিসে লুটপাট করে মানুষকে দমিয়ে রাখা যায় না।

স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সংবিধান লঙ্ঘন করে এখন পুলিশ দিয়ে দেশ চালাচ্ছেন শেখ হাসিনা। আগামী নির্বাচন হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে।

স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, সরকার ভয় পেয়ে তাঁদের ওপর নারকীয় তাণ্ডব চালিয়েছে। স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, গত ৭ ডিসেম্বর তাঁদের ওপর সরকারের কর্মচারীরা যে হামলা করেছে, তা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হামলার চেয়ে কম কিছু নয়।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমান উল্লাহ আমানের সভাপতিত্বে এবং মহানগর দক্ষিণের রফিকুল আলম মজনু ও উত্তরের আমিনুল হকের সঞ্চালনায় সমাবেশে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, বরকত উল্লাহ বুলু, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, আহমেদ আজম খান, কেন্দ্রীয় নেতা ফরহাদ হালিম ডোনার, মাহবুব উদ্দিন খোকন, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল প্রমুখ বক্তব্য দেন। সমাবেশে ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, আবদুল আউয়াল মিন্টু, শামসুজ্জামান দুদু, নিতাই রায় চৌধুরী, মজিবর রহমান সরোয়ার, হাবিব উন নবী খান সোহেলসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

পদত্যাগ প্রসঙ্গে যা বলছেন তাঁরা: সংসদ থেকে পদত্যাগ প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, আমাদের সবার পদত্যাগপত্র অলরেডি স্পিকারের কাছে ই-মেইলে পাঠিয়ে দিয়েছি। আগামীকাল (আজ রোববার) হাতে হাতে সংসদে পৌঁছে দেব আমরা। সংসদে যাওয়ার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, দলীয় সিদ্ধান্তে আমাদের সংসদে পাঠানো হয়েছে। আমরা বলেছিলাম, যতটুকু সংসদে স্পেস পাই, ততটুকুর সদ্ব্যবহারের চেষ্টা করব। এখন অবস্থান বদলের কারণ ব্যাখ্যা করে রুমিন ফারহানা বলেন, আপনারাও দেখেছেন, অধিবেশনে আমি দাঁড়ালেই মাইক বন্ধ করে দেওয়া হয়, কথা বলতে দেওয়া হয় না। যখন আমি আপনাদের কথা, জনগণের কথা বলতে চেয়েছি, আমাকে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই এ সংসদে থাকা আর না থাকার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এ পরিপ্রেক্ষিতে সংসদ থেকে আমরা পদত্যাগ করছি।

বগুড়া-৬ আসনের গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ বলেন, সরকারের গণবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে পদত্যাগ করে সংসদ বাতিলের দাবির সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করছি। সুস্থ মস্তিস্কে আজ ঘোষণা করছি- এই সংসদ থেকে পদত্যাগ করলাম। যা অবিলম্বে কার্যকর হবে। দেশের বাইরে থাকায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের মো. হারুনুর রশীদের পক্ষে গোলাম মোহাম্মদ পদত্যাগের কথা জানান।

বগুড়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোশাররফ হোসেন বলেন, যে গণতন্ত্রের জন্য মানুষ যুদ্ধ করেছিল, জীবন দিয়েছিল, দেশকে স্বাধীন করেছিল, সেই স্বাধীনতাকে খর্ব করেছে। বিএনপির পার্টি অফিসের সামনে আমাদের নেতাকে গুলি করে। আমাদের চাওয়া ছিল, ১৭ কোটি মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া। সরকার কোনো কিছুকে তোয়াক্কা করেনি। আমরা দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মেনে নিয়ে অবৈধ সংসদ থেকে পদত্যাগ করলাম।

তাঁদের মতো করে একে একে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের আমিনুল ইসলাম, ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের জাহিদুর রহমান এমপি তাঁদের পদত্যাগের কথা জানান। এ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের আবদুস সাত্তার শারীরিক অসুস্থতার কারণে সমাবেশে উপস্থিত থাকতে না পারলেও পদত্যাগপত্রে সই করেছেন।

১০ দফায় যা থাকছে: দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের অনুপস্থিতিতে যুগপৎ আন্দোলনের ১০ দফা দাবি তুলে ধরেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। গণআন্দোলনের ১০ দফা হচ্ছে- সংসদ বিলুপ্ত করে বর্তমান সরকারের পদত্যাগ; ১৯৯৬ সালে সংবিধানে সংযোজতি ধারা ৫৮-খ, গ ও ঘ-এর আলোকে দলনিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন বা অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন; বর্তমান কমিশন বিলুপ্ত করে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন; খালেদা জিয়াসহ সব বিরোধীদলীয় নেতাকর্মী, সাংবাদিক ও আলেমদের সাজা বাতিল ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের পাশাপাশি নতুন মামলায় গ্রেপ্তার বন্ধ ও সভা-সমাবেশে বাধা সৃষ্টি না করা; ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ ও বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪-সহ মৌলিক মানবাধিকার হরণকারী সব কালাকানুন বাতিল; বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গ্যাস, পানিসহ জনসেবার খাতে মূল্যবৃদ্ধির গণবিরোধী সিদ্ধান্ত বাতিল; নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনা; গত ১৫ বছরে বিদেশে অর্থ পাচার, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত ও শেয়ারবাজারসহ রাষ্ট্রীয় সব ক্ষেত্রে সংঘটিত দুর্নীতি চিহ্নিত করার লক্ষ্যে কমিশন গঠন; গুমের শিকার সব নাগরিককে উদ্ধার, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের প্রতি ঘটনার দ্রুত বিচারসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, উপাসনালয় ভাঙচুর ও সম্পত্তি দখলের বিচার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও বিচার বিভাগে সরকারি হস্তক্ষেপ বন্ধ করে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও দলের স্থায়ী কমিটির পক্ষ থেকে এই ১০ দফা উপস্থাপন করার কথা জানিয়ে ড. খন্দকার মোশাররফ বলেন, এই দফাগুলো নিয়ে যুগপৎ আন্দোলনকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মতামত ও সম্মতি নেওয়া হয়েছে।

বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে এই ১০ দফার প্রতি একাত্মতা ঘোষণার আহ্বান জানিয়ে বিএনপির এই শীর্ষ নেতা বলেন, আমরা আশা করি, এই দফার সঙ্গে তারাও একাত্মতা ঘোষণা করবে। আগামী দিনে এই ১০ দফা আদায়ে প্রতিটি আন্দোলন কর্মসূচি আমরা যুগপৎভাবে পালন করব।

সায়েদাবাদ জনপথ মোড় থেকে কমলাপুর স্টেডিয়াম মোড়: রাজধানীর গোলাপবাগ মাঠের সমাবেশের বিস্তৃতি আশপাশের কয়েক কিলোমিটার ছাড়িয়ে যায়। একদিকে সায়েদাবাদের জনপথ মোড়; অন্যদিকে কমলাপুর স্টেডিয়াম মোড় অতিক্রম করে প্রতিটি অলিগলিতে নেতাকর্মীর ঢল নামে। তবে পর্যাপ্ত মাইক না থাকায় সারাদেশ থেকে আসা নেতাকর্মীর একটি বড় অংশ সমাবেশের বক্তব্য শুনতে পারেননি। সকাল থেকে ইন্টারনেট সেবাও বন্ধ ছিল সমাবেশ এলাকায়। দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছিল বন্ধ। এরপরও উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে লাখ লাখ মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে গোলাপবাগ এলাকা।

ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশের স্থান নিয়ে সৃষ্ট অনিশ্চয়তার মধ্যে শুক্রবার বিকেলে গোলাপবাগ মাঠ নির্ধারণের এক ঘণ্টার মধ্যে পুরো সমাবেশের মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। রাতভর নেতাকর্মীরা সমাবেশের মাঠে অবস্থান নিয়ে মিছিল আর স্লোগানে মাতিয়ে রাখেন। তাঁদের সঙ্গে অনেক সিনিয়র নেতাও শীতের রাতে খোলা আকাশের নিচে রাতযাপন করেন।

সকালের সূর্য ওঠার আগেই বিভিন্ন এলাকা থেকে স্রোতের মতো গোলাপবাগে আসতে শুরু করেন নেতাকর্মীরা। অনেকে দূর-দূরান্ত থেকে সাইকেলে করে, অনেকে হেঁটে আবার অনেকে ভ্যানে করে সমাবেশে উপস্থিত হন। দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা থেকে নেতাকর্মীরা অংশ নেন। তাঁদের সঙ্গে অনেক সাধারণ মানুষকেও দেখা যায়।

সমাবেশে নরসিংদী সদর থেকে আসা ইসমাইল হোসেন নামে এক ভ্যানচালক জানান, শুক্রবার সকালে তিনি উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেনে ঢাকায় আসেন। রাতে মাঠেই ছিলেন। শুধু চা-পানি আর বিস্কুট খেয়েছেন। সব দোকানপাট বন্ধ থাকায় এর বেশি কিছু ভাগ্যে জোটেনি।

তাঁর মতো আরও অনেক সাধারণ মানুষ এসেছেন সমাবেশে। তাঁদের প্রত্যেকের বক্তব্যে দ্রব্যমূল্য, ভোটাধিকার, আইনশৃঙ্খলা, ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী কর্তৃক অত্যাচার-নির্যাতনের বিষয়গুলো উঠে এসেছে।

মাইক সংকট: মাঠ ও এর আশপাশের দেড় কিলোমিটারজুড়ে মাত্র ১৫০টি মাইক লাগানো হয়। এতে সমাবেশে আসা একটি বড় অংশ নেতাদের বক্তব্য শুনতে পারেননি। সমাবেশ প্রস্তুতি কমিটির এক নেতা জানান, শুক্রবার রাতে তাঁদের ৪০০টি মাইক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী র‌্যাব নিয়ে গেছে। যে মালিক মাইক দিয়েছেন তাঁকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

দোকানপাট বন্ধ, অভুক্ত নেতাকর্মী: সমাবেশ এলাকায় খাবারের হোটেল থেকে শুরু করে অন্য সব দোকানপাট বন্ধ থাকায় খাবার ও পানি সংকট ভুগিয়েছে নেতাকর্মীকে। সমাবেশ থেকে তিন-চার কিলোমিটার দূরে গিয়ে অনেকে খেয়ে আসতে পারলেও বেশিরভাগ নেতাকর্মী সকাল থেকে অভুক্তই ছিলেন।

সন্তান নিয়ে আগমন: ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশে বিএনপির নেতাকর্মী ছাড়াও অনেক উৎসাহী জনতা তাঁদের সন্তান সঙ্গে নিয়ে সমাবেশে আসেন। তাদের মধ্যে আশুলিয়া থেকে মায়ের হাত ধরে সমাবেশে আসে সালেহীন। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে সে। তার মা স্কুলশিক্ষিকা রুনা লায়লা জানান, ইতিহাসের সাক্ষী হতে যেমন এসেছি, তেমনি নতুন প্রজন্মকে বিকৃত ইতিহাস থেকে বাস্তবতার ইতিহাস জানাতে নিয়ে এসেছি।

মন্তব্য করুন

Logo

© 2023 Dinkal24 All Rights Reserved.