'বেকারদের বোবাকান্না কেউ দেখেও না, শোনেও না'

'দ্রব্যমূল্যের কশাঘাতে চাকরিজীবীদেরই যেখানে হাঁসফাঁস অবস্থা, সেখানে আমাদের কী করুণ দশা, একবার অনুধাবন করতে পারেন?' 

গতকাল মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর মিরপুর-২ নম্বরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সামনে চাকরির দাবিতে মানববন্ধনে অংশ নেন তিনি। আবদুল হাকিম এসেছেন সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার মাথিউড়া গ্রাম থেকে। অনেক আশা নিয়ে ২০১৮ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। প্রাথমিক বাছাই, লিখিত ও মৌখিকে উত্তীর্ণ হয়েও চাকরি পাননি। ২০১৮ সালের শূন্য পদে নিয়োগপ্রত্যাশী আবদুল হাকিমের মতো সারাদেশে রয়েছেন প্রায় ৩০ হাজার প্রার্থী। তাঁদের মধ্যে দুই শতাধিক শিক্ষক নিয়োগের দাবিতে গতকালের মানববন্ধনে অংশ নেন।

নিয়োগপ্রত্যাশীদের মধ্যে বাহাদুর রহমান বলেন, ২০১৮ সালের ওই প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও তাঁরা নিয়োগবঞ্চিত। নিয়োগ-বাণিজ্য ও দীর্ঘসূত্রতা এর প্রধান কারণ। ২৪ লাখ পরীক্ষার্থীর মধ্যে তাঁরা ৫৫ হাজার ২৯২ জন লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন, যা মোট পরীক্ষার্থীর মাত্র ২ দশমিক ৩৫ শতাংশ। তাঁদের মধ্যে ১৮ হাজার ১৪৭ জনকে চূড়ান্তভাবে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়, যা মোট পরীক্ষার্থীর শূন্য দশমিক ৫৬ শতাংশ। নিয়োগের সুপারিশপ্রাপ্তদের মধ্যে সাড়ে ৩ হাজারের বেশি শিক্ষক আবার যোগদানই করেননি। তিনি বলেন, সব রকম যোগ্যতার পরিচয় দেওয়ার পরও শূন্য পদে আমাদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না। নিত্যপণ্যের বাজারে আগুন। সেই একই বাজারে চাকরিজীবীরা যান, আমরা বেকাররাও যাই। মাছ-মাংস বাদই দিলাম; কোনো সবজির কেজি ৮০ টাকার নিচে নেই। আমরা কী করে বাঁচব!

একই মানববন্ধনে আসা কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার লক্ষ্মীয়া গ্রামের নীপা সুলতানা বলেন, 'আসলে বেকারদের বোবাকান্না কেউ দেখেও না, কেউ শোনেও না।' আমরা যেন সমাজে অচ্ছুত! তিনি বলেন, মাত্র ২ বছর বয়সে মাকে হারিয়ে সৎমায়ের সংসারে বড় হয়েছি। এক পর্যায়ে পরিবারের বাইরে থেকে সংগ্রাম করে পড়াশোনা চালিয়ে গেছি। এখন জীবন ধারণে টিউশনি করতে হচ্ছে। দরিদ্র পরিবার, মেয়ে মানুষ। বিয়ের বয়স হয়েছে, অথচ একটা চাকরির অভাবে ভালো সম্বন্ধ আসে না। সব কষ্টের কথা তো মুখ ফুটে বলাও যায় না।

নীপা জানান, সব যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে সব ধাপ অতিক্রম করেও কেন তাঁরা চাকরি পাবেন না? চাকরির জন্য তিনি কিশোরগঞ্জের ৫ এমপির পাঁচটি ডিও লেটার (আধা সরকারিপত্র) জমা দিয়েছেন। তাঁর মতো ৬৪ জেলার চাকরিপ্রার্থীরা মন্ত্রী-এমপিদের মোট ১৮৩টি ডিও লেটার জমা দিয়েছেন। পদ শূন্য থাকার পরও তাঁদের এই দুর্মূল্যের বাজারে চাকরি থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এটি অবিচার।

জিয়াউল হক জিয়ার বাড়ি জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার পূর্ব নলছিয়া গ্রামে। তিনিও ২০১৮ সালের প্রাথমিক শিক্ষকের শূন্য পদে নিয়োগপ্রত্যাশী। অশ্রুসজল জিয়া বলেন, আমার সরকারি চাকরির বয়স বেশ আগেই শেষ। বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মা। অসুস্থ তাঁদের জন্য ওষুধ লাগে প্রতি মাসে অনেক টাকার। বাবা ছিলেন কৃষক; হতদরিদ্র পরিবার।

কোনো সঞ্চয় নেই। বাধ্য হয়ে কিছুদিন আগে একটা নন-এমপিও প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে চাকরি নিয়েছিলাম। সেখানেও কিছু হয়নি। বর্তমানে আমি শতভাগ বেকার। বিয়েও করতে পারিনি। বেকারকে এই সমাজে কেউ মেয়ে দেন না।
জিয়াউল হক বলেন, চরম হতাশায় নিমজ্জিত। জীবন থেকে বিদায় নিতে মন চায় মাঝেমধ্যে। বৃদ্ধ মা-বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে তাও পারি না!

চাকরির দাবিতে গত দু'দিনে রাজধানী ঢাকায় অন্তত দুটি কর্মসূচি পালিত হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষক পদে ২০১৮ সালে উত্তীর্ণ হয়ে নিয়োগবঞ্চিতরা গতকাল মঙ্গলবার মিরপুর-২ নম্বরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সামনে চাকরির দাবিতে মানববন্ধন করেন। আর বেসরকারি স্কুল-কলেজে শিক্ষক নিয়োগের চতুর্থ গণবিজ্ঞপ্তি জারির দাবিতে ইস্কাটনে 'বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ'র (এনটিআরসিএ) কার্যালয়ের সামনে সোমবার দিনভর অনশন করে 'চতুর্থ গণবিজ্ঞপ্তিপ্রত্যাশী ফোরাম'।

গতকাল ওই অনশনস্থলে কথা হয় বেশ কয়েকজন নিয়োগপ্রত্যাশীর সঙ্গে। গাজীপুরের জয়দেবপুর থেকে আসা এমএ আলম বলেন, বর্তমানে চার সদস্যের একটি পরিবারের খেয়ে-পরে কোনো রকম বেঁচে থাকতে গেলে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা দরকার। সেখানে চাকরিবিহীন কীভাবে সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকা সম্ভব! সরকারি, বেসরকারি প্রতিটি নিয়োগই অত্যন্ত ধীর। কারণ যাঁরা এসব দায়িত্বে আছেন, তাঁরা তো বেকার নন! আমার কষ্ট তাঁরা বুঝবেন কেমন করে? কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলা সদরের বাসিন্দা রাশেদ অর্ণব বলেন, তিনি আগেও কয়েকবার নিবন্ধন করেছেন। তখন ইনডেক্সধারীদের কারণে চাকরি হয়নি। ১৬তম নিবন্ধন পরীক্ষায় তিনি দ্বিতীয় হয়েছেন, অথচ এনটিআরসিএ গণবিজ্ঞপ্তি না দেওয়ায় তাঁর চাকরি হচ্ছে না- বয়স এখন ৩৬। এনটিআরসিএর নিয়ম অনুসারে ৩৫ বছরের পর আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিতে ঢোকার সুযোগ নেই। তাই দ্রুত চতুর্থ গণবিজ্ঞপ্তির দাবিতে এ অনশনে অংশ নিচ্ছেন। অর্ণব জানান, তিনি বিবাহিত; স্ত্রী ও এক পুত্র রয়েছেন। বর্তমানে টিউশনি করে খুব কষ্টে জীবন চালান। এটি কোনো জীবন নয়।

একই কথা জানালেন পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার কলেজপাড়া থেকে অনশনে আসা সুমাইয়া বিনতে আমীর বৃষ্টি। বলেন, প্রাইভেট পড়িয়ে জীবন চালাই। কষ্টের কথা আগে বলতে লজ্জা পেতাম; সংকোচ করতাম। দুর্মূল্যের এ বাজারে লজ্জা করে জীবন চলে না। আমার বাবাও শিক্ষক ছিলেন। ২০২০ সালে তিনি অবসরে গেছেন। এখন সংসার আমার ওপর নির্ভরশীল। টিউশনিও সব সময় তো থাকে না। পাবনার সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন তিনি। অথচ একটি ভালো চাকরির অভাবে বিয়ে করতে পারছেন না। সংসারও চালাতে পারছেন না। তাঁর মতে, এনটিআরসিএ ৪ বছর ধরে তাঁদের ঘুরাচ্ছে। একটা চাকরির জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে ঘুরতে এখন তাঁরা হয়রান ও হতাশ।

মন্তব্য করুন

Logo

© 2023 Dinkal24 All Rights Reserved.