সংঘাতের শঙ্কায় উদ্বিগ্ন কূটনীতিকরাও

রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির ১০ ডিসেম্বরের গণসমাবেশ ঘিরে ঢাকার কূটনীতিকরাও উদ্বিগ্ন। সরকার যদি বিএনপির ওপর বল প্রয়োগ করে, তবে বিএনপিও সেটির সমুচিত জবাব দেবে- এমন বার্তাই দলটির তরফ থেকে কূটনীতিকদের দেওয়া হয়েছে। ফলে ঢাকার এ সমাবেশ ঘিরে সংঘাতের শঙ্কা করছেন তাঁরা। এ বিষয়ক 'তারবার্তা' নিজ নিজ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে বিদেশি মিশনগুলো। তবে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আজ মঙ্গলবার বিকেলে বিদেশি মিশনগুলোকে ব্রিফ করবে বিএনপি।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে গত বছরের ১০ ডিসেম্বর র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দেয়। এরপর এ বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে বিরোধী দলগুলোর মেরূকরণ, কূটনীতিকদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক, নির্বাচন নিয়ে বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর মনোভাব ও কূটনীতিকদের মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের বক্তব্য রাজনীতির মাঠে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। সেই সঙ্গে অক্টোবর থেকে বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশগুলো 'রাজনৈতিক মন্দা' কাটানোর চেষ্টা করছে।

রাজনীতি অঙ্গনে সরকার ও বিরোধী দলের সরব উপস্থিতি গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ হিসেবে দেখলেও সংঘাতের শঙ্কায় কূটনীতিকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। এ ক্ষেত্রে আগের অভিজ্ঞতা সামনে আনছেন তাঁরা। বিশেষ করে ১৯৯০, ১৯৯৬, ২০০৬ ও ২০১৪ সালের বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাকে তাঁরা উদাহরণ হিসেবে টানছেন। তাঁদের মতে, বাংলাদেশে যারাই বিরোধী দলে গিয়ে আন্দোলন করেছে, তাদেরই সংঘাতের ইতিহাস রয়েছে। ফলে ১০ ডিসেম্বর বিএনপির ঢাকার গণসমাবেশ ঘিরে সহিংসতার আশঙ্কা করছেন কূটনীতিকরা। কূটনীতিকদের নিজ নিজ দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দূতাবাসের সব কর্মকর্তাকে এরই মধ্যে নিরাপত্তা প্রটোকল মেনে বাংলাদেশে চলাফেরার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

'চ্যাটেম হাউস' নীতি অবলম্বনে ঢাকার পশ্চিমা দূতাবাসের উপরাষ্ট্রদূত আলাপচারিতায় সমকালকে বলেন, 'আমাদের কাছে বিএনপি থেকে যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, তা বিশ্নেষণ করে আমরা উদ্বিগ্ন। কারণ বিএনপি জানিয়েছে, সরকারের পক্ষ থেকে তাদের ওপর বলপ্রয়োগ করা হলে তারাও ছেড়ে কথা বলবে না। আমাদের বিশ্নেষণ অনুযায়ী, বিএনপি চাইছে তাদের ওপর হামলা হোক। এতে সংঘাত ও নিরাপত্তাজনিত সংকট সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে আমাদের, যা উদ্বেগের বিষয়।'

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহসম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা এমপি বলেন, 'বিএনপি সারাদেশে ৯টি শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করেছে। সহিষুষ্ণতা বজায় রেখে আমরা এসব সমাবেশ করেছি। ১০ ডিসেম্বরও একইভাবে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করতে চাই। সরকারই পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে। কারণ, আওয়ামী লীগ সহিংসতায় বিশ্বাস করে।'
অতীতে আওয়ামী লীগ অগ্নিসন্ত্রাস করে বিএনপির নামে গায়েবি মামলা দিয়েছে অভিযোগ করে রুমিন ফারহানা বলেন, 'এবারও আওয়ামী লীগ তা-ই করছে। এরই মধ্যে ঢাকার সমাবেশ ঘিরে সারাদেশে ২ হাজার ৭০০ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে এবারের সংগ্রাম বিএনপির একার নয়, এটি সারাদেশের মানুষের অস্তিত্বের সংগ্রাম। এ জন্যই এত বাধা-বিপত্তির পরও বিএনপির সমাবেশে লাখো মানুষের সমাগম ঘটছে। ঢাকার সমাবেশও তা-ই হবে। যদি কোনো অঘটন ঘটে, সেটি আওয়ামী লীগই করবে।'

সরকারের তরফ থেকে পুরো বিষয়টি যেভাবে সমন্বয় করা হচ্ছে, তাতে অপরিপকস্ফতা দেখছেন ঢাকার বিদেশি মিশনের কূটনীতিকরা। তাঁদের মতে, সরকার কোনো নির্দিষ্ট দলের সম্পত্তি নয়। সরকারকে সবার সঙ্গে সম-আচরণ করতে হবে। যেহেতু দীর্ঘদিন ধরে বিএনপিসহ অন্য বিরোধী দলগুলোকে করোনাসহ বিভিন্ন কারণে গণতন্ত্র চর্চায় বেগ পেতে হয়েছে, ফলে আগামী নির্বাচন ঘিরে তাদের মতপ্রকাশ, সভা-সমাবেশের মতো গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা সরকারকেই নিতে হবে।

নাম না প্রকাশ করার শর্তে পশ্চিমা আরেক দূতাবাসের এক কূটনীতিক বলেন, 'আমাদের অবস্থান পরিস্কার। বন্ধু দেশে ২০১৪ বা ২০১৮ সালের মতো নির্বাচন আমরা দেখতে চাই না। আমরা অবাধ, মুক্ত, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পক্ষে। বর্তমান ক্ষমতাসীন দলও অবাধ, মুক্ত ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের বিষয়ে আমাদের জানিয়েছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সব পক্ষেরই নির্বাচন নিয়ে অভিন্ন ধারণা। এখন বিষয় হচ্ছে, এ ধারণা মাঠ পর্যায়ে কতটুকু বাস্তবায়ন হচ্ছে? অবাধ, মুক্ত ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের বিষয়ে বিরোধী দল ও জনগণকে বিশ্বাস করানোর দায়িত্ব সরকারের। কোনো বিদেশি রাষ্ট্র এসে এটি করে দেবে না।'

এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. শাম্মী আহমেদ বলেন, 'সরকার বিরোধী দলের সভা-সমাবেশে কখনও বাধা দেয় না। সরকার যদি বাধাই দিত, তাহলে কি বিরোধী দল সভা-সমাবেশগুলো করতে পারত?' তিনি আরও বলেন, 'আওয়ামী লীগ আন্দোলন-সংগ্রাম করেই এই পর্যায়ে এসেছে। আন্দোলন-সংগ্রাম কীভাবে করতে হয়, সেটাও আমরা জানি। আর আমরা বিরোধী দল ও মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারে বিশ্বাসী। আমরা তো কখনও অন্যের সভা-সমাবেশে বাধা দেব না।'

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে পশ্চিমা কূটনীতিকরা নিজেদের স্বার্থ বিবেচনায় নিজ নিজ কৌশল ও অবস্থান নিচ্ছেন। তাঁদের মতে, কোনো দেশই নিখুঁত নয়। এ জন্য প্রতিটি দেশকে পর্যাপ্ত সময় ও সুযোগ দিতে হবে। এ জন্য প্রতিনিয়ত নিখুঁত হওয়ার পক্ষে কাজ করতে হবে। গণতান্ত্রিক ধারা পুনরুদ্ধারের পর কোনো দেশ যদি পেছনের দিকে চলতে থাকে, তা দুঃখজনক।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আরেক কূটনীতিক সমকালকে বলেন, 'আমরা পশ্চিমারা এটিকে বিভক্তি বলছি না। আমরা বন্ধুরাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে একমতে আসতে পারিনি। প্রতিটি দেশেরই নিজ নিজ অগ্রাধিকার রয়েছে। তবে ঐকমত্যে আসতে এখানে থাকা মিশনগুলো কাজ করছে।'

পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের বিনিয়োগ উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে পাশে রয়েছে। ঘাটতি বাজেট পুষিয়ে নেওয়া বা ঋণ ও অনুদানের জন্য তাদের ওপর বাংলাদেশের বড় ধরনের নির্ভরশীলতা ছিল। এতে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মানবাধিকার, বাক্‌স্বাধীনতা, শ্রম পরিবেশ ও মানসহ বিভিন্ন বিষয়ে দেশগুলোর তরফ থেকে এক ধরনের চাপ ছিল। এখন উন্নয়ন সহযোগী নির্ভরশীলতা অনেকাংশেই কমেছে।

ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণে আগে থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল বাংলাদেশ। বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক সমীকরণে এ গুরুত্ব আরও বেড়েছে। পশ্চিমারা বাংলাদেশকে এখন শুধু উন্নয়ন সহযোগী দেশ হিসেবে বিবেচনা করে না; ব্যবসায়িক দিক থেকে গুরুত্ব বাড়ায় তাদের সঙ্গে সম্পর্কেও বদল আসছে। ফলে নিজ ব্যবসা ও বিনিয়োগ স্বার্থে এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ক্রমাগত বৈঠক করছেন কূটনীতিকরা। কূটনীতিকরা জানতে চাইছেন, আগামীর বাংলাদেশ কোন দিকে যাবে। যার ওপর ভিত্তি করে সম্পর্ক, ব্যবসা, বিনিয়োগের অঙ্ক কষবেন তাঁরা।

নাম না প্রকাশের শর্তে পশ্চিমা দেশের আরেক কূটনীতিক বলেন, বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিজ থেকেই বাংলাদেশের গুরুত্ব বহু গুণ বাড়িয়েছে। তবে সবকিছুর পরও একটি নিয়মভিত্তিক শাসনব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ম মেনে কাজ করতে দিতে হবে। আগামী নির্বাচন ঘিরে এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি যে পর্যায়ে রয়েছে, তাতে নির্বাচন যদি অংশগ্রহণমূলক না হয়, সে ক্ষেত্রে কিছুই করার থাকবে না বিশ্বের, যেমনটি হয়েছিল ২০১৪ সালে। বিরোধী দল যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে আর যদি কারচুপি হয়, সে ক্ষেত্রে মতপ্রকাশ করতে পারবেন বিদেশিরা। তবে নির্বাচন সহায়ক পরিবেশ সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ১৯৭২ সালের সংবিধান অনুযায়ী দেশ পরিচালনার পক্ষে মত দেন তিনি।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বর্তমানে বিশ্বের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে যে মন্দা ভাব চলছে, বাংলাদেশ এর বাইরে নয়। এ পরিস্থিতিতে যদি সুষ্ঠু নির্বাচনও হয়, তাতে যে দলই সরকার গঠন করুক না কেন, তারা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে মনে করেন বেশ কিছু কূটনীতিক। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের উদাহরণ টেনে আনেন তাঁরা। ইমরান খানের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে তাঁকে সরিয়ে ক্ষমতায় আসেন শাহবাজ শরিফ। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি টের পেয়েছেন, অর্থনৈতিক এ মন্দা পরিস্থিতিতে ক্ষমতা গ্রহণ ঠিক হয়নি। পাকিস্তানে এখন পুরো দোষ ও দায়দায়িত্ব বর্তমান ক্ষমতাসীনদের ওপর যাচ্ছে, যা মূলত ইমরান খানের ওপর যেত।

মন্তব্য করুন

Logo

© 2023 Dinkal24 All Rights Reserved.